🧱 সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের জন্য ব্রিক ওয়ার্কের গুরুত্ব ও প্রাথমিক ধারণা
একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের জন্য অন্যান্য সাধারণ কাজগুলোর মধ্যে ব্রিক ওয়ার্ক হচ্ছে অন্যতম একটি। আমাদের দেশে আমরা সাধারণত দুই ধরনের ব্রিক ওয়ার্ক করে থাকি। নিচে ব্রিক ওয়ার্ক, ইটের গাঁথুনির প্রকারভেদ, বন্ড ও নির্মাণের পূর্বে এবং চলাকালীন সকল নিয়ম বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
✅ ব্রিক ওয়ার্কের প্রকারভেদ
Ordinary Brick Work (সাধারণ ব্রিক ওয়ার্ক)
যা আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, এই ধরনের কাজে ইট দিয়ে গাথুনি তৈরির পর গাথুনি পৃষ্ঠকে ড্যাম্প ও আবহাওয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা এবং সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য প্লাস্টার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
Pointing Brick Work (পয়েন্টিং ব্রিক ওয়ার্ক)
যেখানে ব্রিক ওয়ালের জয়েন্টগুলোর সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্য ইহার উপরে কোন আস্তর বা প্লাস্টার প্রদান করা হয়না, গাথুনি পরবর্তীতে জয়েন্টগুলোকে পয়েন্টিং করে দেওয়া হয়। পয়েন্টিং ব্রিক ওয়ার্ক সচরাচর ১০ ইঞ্চির হয়ে থাকে।
📐 ইটের গাঁথুনির বন্ড (Types of Brick Bonds)
📋 গাথুনির কাজ শুরুর পূর্বে যা যা করতে হবে
- ইট ভিজানো: কাজ শুরুর ২৪ ঘন্টা পূর্বে ইট পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। শুষ্ক ইট মসলার পানি শুষে নেয়, ফলে হাইড্রেশন ব্যাহত হয় ও গাথুনি দুর্বল হয়। অত্যাধিক ভিজা ইটেও মসলা নরম হয়ে জয়েন্টের পুরুত্ব কমে যায়।
- বালি চালা ও ভিজানো: উত্তম কোয়ালিটি পেতে বালি চেলে নিতে হবে ও ইটের মত ভিজিয়ে নিতে হবে।
- চিপিং (Chipping): পুরাতন বা নতুন সকল RCC সারফেসকে 2-3mm deep & 3/4 to 1” c/c distance চিপিং করে পরিষ্কার ও ভিজিয়ে কাজ শুরু করতে হবে।
- সিমেন্ট স্যান্ড মসলা: পানি দেওয়ার পূর্বে শুষ্ক মিশ্রণকে তিন ধাপে নেড়ে (তিন কাটা) মসলা তৈরি করুন – দুই কাটার কম করবেন না।
- মসলার অনুপাত: ৫” গাথুনিতে সাধারণত ১:৪ বা ১:৫ মসলা; ১০” এর জন্য ১:৬ বা ১:৫ মসলা। মসলা প্রস্তুতের ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবহার শেষ করা উত্তম।
🔨 কাজ চলাকালীন সতর্কতা সমূহ
- লে-আউট: ড্রইং অনুযায়ী দরজার জন্য নির্দিষ্ট ফাকা রেখে প্রতি রুমে এক ইট করে লে-আউট গাথুনি করুন। চিপিং ও পানি ভিজানোর পর ফ্লোর পরিষ্কার করে কাজ শুরু করুন। গ্রাউটিং করে নিলে ভালো হয়।
- গাথুনির উচ্চতা: ৫” গাথুনিতে একদিনে সর্বোচ্চ ৪.৫ ফুট, ১০” গাথুনিতে ৫ ফুট পর্যন্ত করা যাবে। বেশি উচ্চতা করলে গাথুনি শল আউট বা হেলে পড়তে পারে।
- উলম্ব শল (Plumb): কাজ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতি কয়েক ইট পর পর শল চেক করতে হবে। প্রথম ও শেষ ইট নির্ধারণ করে রাখা ভালো।
- মসলার জয়েন্ট: হরিজনটালি ও ভার্টিক্যালি ½” (12mm) পুরুত্বের মসলা দিতে হবে এবং সর্বত্র সমান রাখতে হবে।
- লেভেল: নিয়মিত লেভেল চেক করুন, বিশেষ করে ৭ ফিট গিয়ে লেভেল ঠিক করুন, নচেৎ লিন্টেল বসাতে অসুবিধে হবে।
- জয়েন্টে ছিদ্র বা ভয়েড: কোন অবস্থাতেই এলাউ করবেন না। মিস্ত্রিকে কর্নি দিয়ে মসলা কুপিয়ে দিতে বলুন এবং ইটের উপরে ও পাশে হালকা আঘাত করে গাথুনি করতে বলুন।
- ফ্ল্যাশ সাইড: আউটার দেয়ালের বাহিরের দিকে ফ্লাশ রাখা উত্তম – প্লাস্টারের পুরুত্ব ঠিক থাকে ও দেখতে সুন্দর লাগে।
- ফ্রগমার্ক (ইটের সিল): সব সময় উপরের দিকে থাকবে, এতে দুই ইটের মাঝে উত্তম বন্ড তৈরি হয়।
- বিমের নিচের গাথুনি বা সর্বশেষ গাথুনি: ফাকা যেন না থাকে; থাকলে মসলার সাথে ইটের টুকরা ঢুকিয়ে দিবেন, না হলে RCC এর সাথে প্লাস্টার ছেড়ে ফাটল দেখাবে।
- মাটাম বা টুথিং: ৯০° কোণে নতুন গাথুনি করার জন্য প্রতি এক ইট পর ইটকে কিছুটা বর্ধিত রাখাকে টুথিং বলে। বন্ডিং এর জন্য এর বিকল্প নেই।
- পুটলগ বা ডগনার ছিদ্র: ৫ ফিটের উপরে গাথুনিতে মিস্ত্রিরা যে ফাকা রাখে তা প্লাস্টারের পূর্বে ইট দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে, নচেৎ লিকেজের সম্ভাবনা থাকে।
- ঝাড়ু বা পরিষ্কার: জয়েন্টগুলো হরিজনটালি ও ভার্টিক্যালি ঝাড়ু দিয়ে দিলে ফাকা ভরাট হয় ও দেখতে সুন্দর হয়।
- লিন্টেল ও দরজার সাটারিং: গাথুনি শক্ত হবার পূর্বে সাটারিং দিবেন না, এতে ফাটল দেখা দিতে পারে।
- কিউরিং: প্রতিদিন দুইবেলা করে ৭ থেকে ১৪ দিন কিউরিং করবেন।
⚠️ বিশেষ সতর্কতা: জয়েন্টে ছিদ্র বা ভয়েড থাকলে গাথুনি দূর্বল হবে এবং প্লাস্টারের পরও পানি প্রবেশ করে দেয়াল আদ্র ও পেইন্ট নষ্ট করবে। তাই মিস্ত্রিকে কর্নি দিয়ে মসলা কুপিয়ে গাথুনি করতে বলুন।
📌 সংক্ষিপ্ত উপসংহার
সঠিক ব্রিক ওয়ার্কের জন্য ইট ভেজানো, বালি চালা, চিপিং, নির্ধারিত মসলার অনুপাত, উলম্বতা, লেভেল, জয়েন্টের ছিদ্রমুক্ততা ও যথাযথ কিউরিং অত্যাবশ্যক। উপরোক্ত নিয়মগুলো মেনে চললে গাথুনি শক্তিশালী ও টেকসই হয়, ভবিষ্যতে ফাটল বা লিকেজের ঝুঁকি কমে। একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এই বিষয়গুলো জানা ও বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।